বিচার বিভাগের এখতিয়ার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও উচ্চকক্ষ নিয়ে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব

13 Oct 2026
বিচার বিভাগের এখতিয়ার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও উচ্চকক্ষ নিয়ে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব

সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের এখতিয়ার স্পষ্ট করা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে বিকল্প পদ্ধতি নির্ধারণ এবং উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্বের কাঠামো ঠিক করার প্রস্তাব দিয়েছেন শিক্ষাবিদ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির কিছু বিষয় রাষ্ট্রের সামর্থ্য অনুযায়ী মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করা এবং জনগণের সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞা আরও স্পষ্ট করার সুপারিশও এসেছে।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সপ্তম বৈঠকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদরা এসব প্রস্তাব দেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

তিনি বলেন, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংশোধন প্রক্রিয়া, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিকল্প পদ্ধতি এবং সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সুরক্ষার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

 
বিচার বিভাগের এখতিয়ার নির্ধারণের প্রস্তাব
সংবিধানের ব্যাখ্যা ও মৌলিক কাঠামোসংক্রান্ত বিষয়ে বিচার বিভাগের এখতিয়ার সাংবিধানিকভাবে নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন আলোচকরা। তাদের মতে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের এক অঙ্গ যাতে অন্য অঙ্গের ওপর অতিরিক্ত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের ভূমিকা ও এখতিয়ার স্পষ্ট করার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে বিকল্প পদ্ধতি
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন এবং সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব চূড়ান্ত হয়নি।

সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিকল্পগুলোর মধ্যে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা বাদ দেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। আগের বিকল্পগুলোতে ঐকমত্য না হলে শেষ বিকল্প হিসেবে বিচার বিভাগের ভূমিকা রাখার বিষয়ে শিক্ষাবিদদের মতামত পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে তারা লিখিত প্রস্তাবও দেবেন।

উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্ব কীভাবে হবে
সংবিধানে উচ্চকক্ষ গঠন এবং সেখানে প্রতিনিধিত্বের ধরন নিয়েও মতামত দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। উচ্চকক্ষে কোন শ্রেণি ও এলাকার প্রতিনিধিত্ব থাকবে, সদস্যরা কীভাবে নির্বাচিত হবেন, জেলাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব থাকবে কি না এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করা যায় কি না—এসব বিষয় আলোচনায় এসেছে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশ এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দেশ। এ কাঠামোর মধ্যে উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্ব কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে বিভিন্ন মতামত পাওয়া গেছে। লিখিত প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করে কমিটিতে আলোচনা করা হবে।

এ ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির কিছু বিষয় রাষ্ট্রের সামর্থ্য বিবেচনায় মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করা এবং সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে জনগণের সার্বভৌমত্বের বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার প্রস্তাব এসেছে।

বিরোধী দলকে আলোচনায় আসার আহ্বান
সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ না থাকা নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের সাবেক সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজের সমালোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকার জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্যই কাজ করছে। কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের নাম দেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও তারা এখনো নাম দেয়নি।

তিনি বলেন, বিরোধী দল নাম দিলে তাদের স্বাগত জানানো হবে। সরকার চায়, সব পক্ষের অংশগ্রহণ ও সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন হোক। তবে বিরোধী দল অংশ না নিলেও সংশোধনের উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া হবে।

কমিটির প্রতিবেদন তৈরির পর সংশোধনী বিল সংসদে উত্থাপিত হলে বিরোধী দল আলোচনায় অংশ নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। বিরোধী দল অংশ না নিলে এ প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্কের সুযোগ থাকবে বলেও মন্তব্য করেন কমিটির সভাপতি।

তিনি আরও বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে সব বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। নির্বাচনি ইশতেহার ও জনগণের চাহিদার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয়ও সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিবেচনায় নিতে হবে।
আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠক শনিবার

আগামী ২৪ অক্টোবর শনিবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে দিনব্যাপী আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ।

মঙ্গলবারের বৈঠকে জাতীয় অধ্যাপক মাহবুবুল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান, অধ্যাপক গীতিআরা নাসরিন, অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষাবিদরা অংশ নেন।